ওস্তাদ শেখ মোঃ কাওছার আলী(১৯১৯-১৯৯১)

জীবন তথ্য ও শিল্প মানস

ইতিহাস প্রসিদ্ধ ভার্সাই সন্ধির পরের বছর অর্থাৎ ১৯১৯ সালের ১৫ অক্টোবর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার শান্তিপুরে এক সম্ভ্রান্ত রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শেখ মোঃ কাওছার আলী। তাঁর পিতা শেখ আঃ হামিদ এবং মাতা ওয়াহেদা বেগম। তাঁর দাদা শেখ রওশন আলী তদানিন্তন পান্ডুয়া থেকে শান্তিপুরে আসেন ব্যবসা সূত্রে। প্রথিতযশা এই ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বিয়ে করেন শান্তিপুরের এক বিদুষী কন্যা আওলাদুন্নেছা-কে। আওলাদুন্নেছা এতই বিদ্যানুরাগী ছিলেন যে তাঁর অনুপ্রেরণায় এবং আর্থিক সহযোগিতায় শান্তিপুর কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই রওশন আলী দম্পতির ছয় পুত্রের মধ্যে কাওছার আলীর বাবা ছিলেন তৃতীয়। তিনি (আঃ হামিদ) পেশায় ছিলেন একজন সরকারি ডাক্তার। কাওছার আলীর বড় চাচা শেখ রাজ্জাক ছিলেন কলকাতা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচিত মেয়র এবং মেজো চাচা শেখ দাউদ ছিলেন বার-এট-ল। অন্য চাচাদের একজন প্রফেসর, একজন উকিল ছিলেন-অন্যজনের অকালমৃত্যু হয়। সুতরাং বলা যায় সোনার চামচ মুখে নিয়েই কাওছার আলীর জন্ম। পাঁচ ভাই এবং ছয় বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। দুধে-ভাতে শিশুকাল তাঁর ভালই কাটছিল। কিন্তু সংসারে এমন কিছু মানুষ থাকে সুখ যাদের থেকে পালিয়ে বেড়ায়। মাত্র ৫/৬ বছর বয়সে কাওছার আলী মাতৃহারা হন। তিন ভাইবোনকে শিশু অবস্থায় রেখে তাঁর মাতা পরলোক গমন করলে পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। পিতা দ্বিতীয় বার দার পরিগ্রহ করলে বালক কাওছার আলী পাশেই শান্তিপুরে মামা বাড়ির প্রতি ঝুঁকে পড়েন। বাল্যকাল কাটতে থাকে মামা বাড়িতে। তাঁর মামারা ছিলেন সাত ভাই- যাঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন সংস্কৃতিমনা। তাঁদের নিজেদের আঙিনায় ছিল একটি নাট্যমঞ্চ। মামাদের উৎসাহে এবং রক্ত পরিক্রমায় কাওছার আলীর উপর প্রভাব পড়ে সংগীত এবং নাটকের। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দুরন্ত এবং জেদী। দুরন্তপনার জন্য তাঁর মামা মামীরা তাঁকে আদর করে ডাকতেন ‘বজ্জাত’ বলে। বালক বজ্জাতের বাল্যকাল কাটে মামা- বাড়িতে দস্যিপনা ও ‘বজ্জাতি’ করে। স্কুল গামী হলে তাঁকে প্রথমে শান্তিপুরের স্থানীয় মক্তবে ভর্তি করা হয়। মক্তবে আরবী, উর্দু, ফারসী ভাষার সাথে সাথে চলে বাংলা ইংরেজীতে হাতেখড়ি। তিনি ছিলেন মেধাবী এবং বুদ্ধিমান। মক্তবের পড়াশুনার পাশাপাশি চলে মামাদের সাথে গান-নাটকের চর্চা। মাত্র দশ বছর বয়সে মামাদের আঙিনার নাট্যমঞ্চে শরৎচন্দ্রের ‘বিন্দুর ছেলে’ নাটকে ‘অমূল্য’ চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর অভিনয় জীবনের। বালক কাওছার আলীর সুমিষ্ট কণ্ঠের গান তখন সকলের মন কাড়তো। বাল্যকাল অতিবাহিত হওয়ার পর তাঁর একান্নবর্তী পরিবারটি শান্তিপুর থেকে কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। কলকাতার আলীপুর ও মোমিনপুরের দুটি বাড়িতে বসবাস শুরু করেন তাঁরা। মামাদের আদর-আহ্লাদ-আবদার ভোগী কিশোর কাওছার আলী নিজ পরিবারের সাথে চলে আসেন কলকাতায়। ভর্তি হন কলকাতার চেতলা বয়েজ ইংলিশ স্কুলে। লেখাপড়ার পাশাপাশি চলতে থাকে গান বাজনা ও নাটকের চর্চা। তাঁর পিতা ছিলেন ধর্মভীরু মানুষ। তিনি ছেলের এই সংস্কৃতিপ্রীতি ভাল ভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। কাওছার আলী ১৯৩৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশ নেন। লেখাপড়ার অবস্থা তথৈবচঃ। তিনি তখন গানের নেশায় পাগল-পারা। বিভিন্ন মঞ্চে বিখ্যাত সংগীত শিল্পী অপরেশ লাহিড়ী, কে.এল. সাইগল, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের সংগে তখন গান করে বেড়াচ্ছেন। ১৯৩৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশনে অকৃতকার্য হয়ে পুনরায় ১৯৩৮ এ একই পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে কোন রকমে উৎরে যান কিন্তু কলেজ লেখাপড়ায় তাঁর মন বসে না।

১৯৩৯-’৪০ সালের দিকে তিনি বাড়ীতে গোপন করে লক্ষ্মৌ থেকে উচ্চাঙ্গ সংগীতে তালিম নেন। দরাজ কণ্ঠের জন্যে সংগীতজ্ঞ অপরেশ লাহিড়ী তাঁকে খুবই স্নেহ করতেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় ১৯৪২ সালে হিজ মাস্টার্স ভয়েজ গ্রামোফোন কোম্পানীর সঙ্গে কাওছার আলীর গান রেকর্ডিং এর চুক্তি হয় কিন্তু পারিবারিক অসম্মতির কারণে সে চুক্তি বাতিল করতে হয়। এরই জের ধরে রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে, অভিমানে তিনি পরিবার, অর্থবিত্ত, সম্পদ, ঐশ্বর্য সব পায়ে ঠেলে গোপনে নাম লেখান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। ১৯৪২ সালের শেষের দিকে তিনি ভারতীয় মিত্র বাহিনীর পক্ষে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন- এয়ার ক্রাফট টেকনিশিয়ান হিসেবে। বিশ্ব যুদ্ধ শেষ হলে তিনি পরিবারের উপর অভিমান করে অবিভক্ত বাংলার পূর্ববঙ্গে খুলনা জেলায় চাকুরীতে যোগ দেন, স্বাস্থ্য বিভাগের স্বাস্থ্য সহকারী পদে-১৯৪৬ সালে। ১৯৪৭-এ দেশ বিভাগের পর তিনি থেকে যান পূর্ববঙ্গেই। তাঁর অনুসরণে মেজো ভাই শেখ নওশের আলীও চাকুরী নেন পূর্ববঙ্গের পাবনা জেলায়। পরে যিনি যশোর কালেক্টরেটে চাকুরী সূত্রে যশোরে স্থায়ী আবাসন গড়ে তোলেন। তাঁর অপর ভাইয়েরা তখন কলকাতাতেই অবস্থান করছিলেন। তৃতীয় ভ্রাতা শেখ আনোয়ার আলী ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের একজন নামকরা আইনজীবী। অপর দুই ভাই শেখ নেইয়ার আলী ও শেখ কাইছার আলী উচ্চশিক্ষিত এবং কলকাতায় চাকুরিজীবী।

খুলনা জেলার ডুমুরিয়া, দেবহাটা ঘুরে ১৯৫০ সালের দিকে তাঁর পোষ্টিং হয় সাতক্ষীরাতে। তিনি তখন অভিভাবক শূন্য অবস্থায় কতকটা ভবঘুরে-যাযাবর জীবন যাপন করছেন। তাই দেখে তাঁর এক সহকর্মী আব্দুল মাঈন মল্লিক তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। সংসারত্যাগী বিবাহবৈরাগী কাওছার আলী তাঁর কথায় কর্ণপাত করেন না। তখন সংগীতভক্ত মাঈন মল্লিক তাঁর বাড়িতে এক গানের জলসার আয়োজন করে কাওছার আলীকে গান গাওয়ার দাওয়াত দেন। সেই গানের মজলিসে রসিক মাঈন মল্লিক সুকৌশলে পরিচয় করান তাঁর শ্যালিকাকে। কাওছার আলীর জলদগম্ভীর কণ্ঠের গানে তিনি অভিভূত হন এবং কাওছার আলীও সংগীতভক্ত এই রমণীকে দেখে বিয়েতে রাজি হন। এরই জের ধরে ১৯৫২ সালে সাতক্ষীরার অদূরে মল্লিকপাড়া গ্রামের রকিব মল্লিকের উক্ত কন্যা বেগম হুসনেয়ারার সাথে পরিণয়াবদ্ধ হন। এই মহিলা ছিলেন সংগীতভক্ত এবং সাহিত্যানুরাগী। সংগত কারণে কাওছার আলীর সংগীত এবং নাটকের প্রতি ঝোঁক প্রবল হয়। তিনি স্কুল জীবনেই ‘অপ্রকাশ’ নামে একটি নাটক রচনা করেন। সময়ের বিবর্তনে যেটির পান্ডুলিপি অক্ষত পাওয়া যায়নি।

বিবাহোত্তরকালে ১৯৫২ সালে তিনি সাতক্ষীরার কাছারীপাড়ায় গোলপাতার চালের দু’টি মাটির ঘর সহ জমি কিনে থিতু হন। সাহিত্যানুরাগী স্ত্রীর অনুপ্রেরণায় ১৯৫৬ সালে আবার নাটক লেখায় মনোযোগী হন। লেখেন-‘কেন’ নাটক। বিশদ কলেবরের নাটকটির পান্ডুলিপি শেষ হয় ১৯৫৮ সালে। ১৯৬২ সালের ৩ মার্চ নাটকটি স্থানীয় ফ্রেন্ডস ড্রামেটিক ক্লাবের মঞ্চে প্রথম মঞ্চস্থ হয় এবং নাট্যকার ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন। কিন্তু এই নাটকের মঞ্চায়ন দেখে যেতে পারেননি তাঁর স্ত্রী। তিন ছেলে-মেয়ে রেখে ১৯৬০ সালে তিনি পরলোক গমন করেন। স্ত্রী বিয়োগের শোক কাওছার আলীকে নাটক থেকে পেছনে ফেরাতে পারেনি। ‘কেন’ নাটকটি ১৯৬৪ সালের ৩ ও ৪ জুলাই পূর্ব পাকিস্তান শিল্পোন্নয়ন করপোরেশন নাট্য সংসদ (ই.পি.আই.ডি.সি)- এর  প্রযোজনায় ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনষ্টিটিউট মিলনায়তনে অভিনীত হয়।

তাঁর প্রথম স্ত্রী দুই কন্যা আমিনা আওলাদুর রওশন জলি ও সেলিনা আওলাদুর রওশন শেলী এবং একপুত্র শাহাদাত আলীকে রেখে মারা যাওয়ার তিন মাস পর পুত্র শাহাদাত আলী অকাল মৃত্যুবরণ করে। কাওছার আলী দ্বিতীয়বার দার পরিগ্রহ করেন সাতক্ষীরার কাটিয়াস্থ কাজী মহিউদ্দিনের কন্যা মাসুদা খাতুনকে। মাসুদা খাতুনের গর্ভে তাঁর চার সন্তান জন্মগ্রহণ করে। পুত্র মোঃ নাসরুল্লাহেল ওয়াহেদুল হামিদ এবং কন্যাত্রয় আবেদা আওলাদুর রওশন বেলী (অকালমৃত্যু), সাবিনা আওলাদুর রওশন মিলি ও আফ্রিনা আওলাদুর রওশন নেলী। ১৯৬৫ সালে তাঁর পিতার মৃত্যুর সময় সরকারি চাকুরী এবং পাক-ভারত যুদ্ধের কারণে ভিসা না পাওয়ায় তিনি কলকাতা যেতে পারেন নি। সেই ক্ষোভে এবং দুঃখে তিনি তাঁর জীবদ্দশায় আর কলকাতামুখো পা বাড়াননি।

সরকারি চাকুরী এবং সাংসারিক অভাব অনটনের মধ্যেও তাঁর লেখা থেমে থাকেনি। পরবর্তী কালে তিনি যে নাটক গুলো লেখেন তার মধ্যে ‘একটি প্রান্তর’ (১৯৬৫), ‘ওদের কি হলো’ (১৯৬৭), ‘কাঁটাতার’ (১৯৬৯), ‘আম্রকানন যাত্রাপার্টি ’ (১৯৭৪), ‘সিন্ধুবাদের দৈত্য’ (১৯৭৭), ‘আবর্জনার স্ত্তপ থেকে বলছি’- একক নাটক (১৯৮০) এবং ‘অতলান্তিকের প্রান্ত’-বেতার নাটক (১৯৮৭) উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে ‘ওদের কি হলো’ একটি ক্রাইমো সোশ্যাল নাটক। ‘কাঁটাতার’ একটি সামাজিক নাটক। ‘আম্রকানন যাত্রাপার্টি’ একটি ব্যঙ্গাত্মক নাটক এবং ‘সিন্ধুবাদের দৈত্য’ একটি রূপক নাটক। সবগুলো নাটকই সাতক্ষীরা ফ্রেন্ডস ড্রামেটিক ক্লাব ও শিল্পীচক্রের নিজস্ব নাট্যমঞ্চ সহ বিভিন্ন নাট্যমঞ্চে একাধিকবার মঞ্চস্থ ও প্রশংসিত হয়। বেতার নাটক ‘অতলান্তিকের প্রান্ত’ সাতক্ষীরা সপ্তর্ষি থিয়েটারের প্রযোজনায় খুলনা বেতার কেন্দ্র থেকে ১৯৮৮ সালে ৭ জুলাই প্রচারিত হয়।

নাটক রচনার পাশাপাশি তিনি বেশ কিছু ছড়া, কবিতা ও গান রচনা করেন। যার গুটিকয় ব্যতীত অধিকাংশই সংরক্ষণের অভাবে বিনষ্ট হয়েছে।

১৯৭৯-৮০ সালের দিকে তিনি ‘উপলখন্ড’ শিরোনামে একটি গল্পগ্রন্থ লিখতে শুরু করেন। এ গল্পগুলোর মধ্যে ‘আমি স্মাগলার’, ‘সেই কুকুরগুলো’, ‘বড় যদি হতে চাও’, ‘রাজপথ’, ‘সামান্য’, ‘কেমন হতো’, ‘দিববু ঘোষের দিব্যজ্ঞান’, ‘ফেলুদা স্মরণে’ উল্লেখযোগ্য-যার অধিকাংশই স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখা আরো কিছু অপ্রকাশিত গল্প ছিলো-যেগুলো সুষ্ঠু সংরক্ষণের অভাবে খুঁজে পাওয়া যায়নি।  

নাটক লেখার পাশাপাশি শেখ মোঃ কাওছার আলী ছিলেন একজন দক্ষ নাট্য নির্দেশক এবং নাট্যাভিনেতা। নিজের লেখা নাটকের প্রায় সবকটিই তাঁর নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয়েছে এবং তিনি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন। ১৯৫৭-৫৮ সালে সাতক্ষীরা পি,কে, ইউনিয়ন ক্লাব প্রযোজিত ‘উল্কা’ ও ‘বিরোধ’ নাটকে অভিনয় করে তিনি দর্শক মন্ডলীর মন জয় করেন। সত্তরের দশকে সাতক্ষীরা ফ্রেন্ডস ড্রামেটিক ক্লাব প্রযোজিত বাৎসরিক প্রতিটি নাটকেই তিনি অভিনয় করেছেন এবং প্রশংসিত হয়েছেন। তাঁর অভিনীত নাটকগুলোর মধ্যে ‘কেন’, ‘ওদের কি হলো’, ‘আম্রকানন যাত্রাপার্টি ’, ‘সিন্ধুবাদের দৈত্য’, ‘অতলান্তিকের প্রান্ত’, ‘শাজাহান’, ‘উত্তরা’, ‘ত্রিরত্ন’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘কবর’, ‘গরীব কেন মরে’, ‘সুবচন নির্বাসনে’ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ঈক্ষণ সাংস্কৃতিক সংসদ প্রযোজিত বিশিষ্ট সংস্কৃতিকর্মী পল্টু বাসার রচিত ও পরিচালিত ১৯৮৭ সালে নির্মিত সাতক্ষীরার প্রথম ভিডিও চলচ্চিত্র ‘অবশেষে একদিন’-এ তিনি অভিনয় করেছেন-যেখানে তাঁর গাওয়া একটি গানও সংযুক্ত করা হয়।

নাটকের পাশাপাশি সংগীত জগতে তাঁর বিচরণ ছিল অবাধ। ভারতীয় বাংলা আধুনিক গানই তিনি বেশি গাইতেন। প্রখ্যাত গায়ক জগন্ময় মিত্রের চিঠির গান-‘তুমি আজ কত দূরে-’ তাঁর কণ্ঠে শুনতে সাতক্ষীরার মানুষ একসময় পাগল ছিল। আধুনিক গানের পাশপাশি কীর্ত্তন, ধর্মীয় গানও তিনি গাইতেন। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সংগীত শিক্ষক। উচ্চাঙ্গ সংগীতে তাঁর পারদর্শিতা ছিল তুঙ্গে। তাঁর অনুপ্রেরণায় এবং উৎসাহে ১৯৭২ সালে সাতক্ষীরার প্রথম সংগীত বিদ্যালয় ‘শিল্পীচক্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘শিল্পীচক্রে’র প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে তিনি প্রধান সংগীত শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। পেশাগত ভাবে তিনি কখনোই সংগীত চর্চাকে ব্যবহার করেননি। সংগীত শিক্ষা প্রদানের বিনিময়ে তিনি কোনোদিন কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেননি। প্রসংগত উল্লেখ্য যে, সাতক্ষীরার তৎকালীন এক মহাকুমা প্রশাসক তাঁর মেয়েকে গান শেখাবার জন্য কাওছার আলীকে বাসায় যেতে অনুরোধ করেন। মাস শেষে মহাকুমা প্রশাসক সাহেব যখন তাঁকে টাকা দিতে গেলেন তখন তাঁর আত্মসম্মানে লাগে- কারণ তিনি শিল্পকে পণ্য হিসাবে দেখেননি। তিনি টাকা না নিয়েই ফেরত আসেন এবং পরবর্তীতে ঐ বাসায় আর যাননি।

শেখ মোঃ কাওছার আলীর একাডেমিক শিক্ষা বেশিদূর না হলেও তিনি বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, হিন্দী এবং ফারসি ভাষায় মোটামুটি পারদর্শী ছিলেন। তাঁর লেখালেখির মধ্যে বিভিন্ন ভাষার সাবলীল প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। তাঁর আর একটি নেশা ছিল বই পড়া। প্রতিদিন শোবার আগে এক ঘন্টা না পড়লে তাঁর ঘুম হতো না। সাতক্ষীরা পি.কে. ইউনিয়ন পাবলিক লাইব্রেরী এবং সাতক্ষীরা কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরীর তিনি ছিলেন আজীবন সদস্য। বই পড়ার ক্ষেত্রে তাঁর কোন বাছবিচার ছিল না। গল্প উপন্যাস যেমন পড়তেন তেমনি পড়তেন অনুবাদ সাহিত্য, ধর্মীয় পুঁথিপুস্তক- এমনকি ইতিহাস, ভূগোল ও দর্শন বিষয়েও তাঁর পড়ার বেশ আগ্রহ ছিল।

ব্যক্তিগত জীবনে শেখ মোঃ কাওছার আলী ছিলেন একজন অত্যন্ত সাদাসিধা, সদালাপী, মিষ্টভাষী মানুষ। সরল সাধারণ জীবন যাপন তিনি পছন্দ করতেন। পারিবারিক জীবনে ছিলেন একজন সন্তান বৎসল স্নেহশীল পিতা। তিনি নিজে খুব ভাল রান্না করতে পারতেন। ছিলেন ভোজনবিলাসীও। আর খুব পছন্দ করতেন নিজ হাতে রান্না করে স্ত্রী ও সব ছেলেমেয়েদের নিয়ে গোল হয়ে বসে খেতে।

জীবনের সমস্তটা সময় নাটক, সংগীত ও সাহিত্য কর্মের প্রতি নিবেদিত প্রাণ এই মানুষটির দারিদ্র্য কখনোই পিছু ছাড়েনি। সরকারি চাকুরীর সামান্য বেতনে সংসার চালাতে হিমশিম খেয়েছেন। বিশেষতঃ ১৯৮১ সালে ‘সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক’ হিসেবে চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণের পর আর্থিক ভাবে আরো দুর্বল হয়ে পড়েন। আর একারণেই তিনি তাঁর ছেলেমেয়েদের কাউকেই এ পথে উৎসাহিত করেননি। তারপরও রক্ত পরিক্রমার একটি ধারা থাকেই। সেই ধারা থেকেই তাঁর কনিষ্ঠ কন্যা আফ্রিনা আওলাদুর রওশন নেলী একজন সাংবাদিক, কলামিষ্ট, মানবাধিকার কর্মী- যিনি ‘নেলী আফরিন’ নামে বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন।

শেখ মোঃ কাওছার আলী ছিলেন একজন কুসংস্কার মুক্ত আলোকিত মানুষ। দারিদ্র্যের চরম কষাঘাতে জর্জরিত হয়েও তিনি কখনোই অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি। তাঁর অধিকাংশ লেখনীই সমাজের নিরীহ, নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের পক্ষে-প্রকারান্তরে সমাজের শাসক এবং শোষক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে। ‘আম্রকানন যাত্রাপার্টি’ নাটকে অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তাঁর কলম সোচ্চার। অপরদিকে ‘কেন’ এবং ‘অতলান্তিকের প্রান্ত’ নাটকে কল্প-বৈজ্ঞানিক মানসিকতার রূপ পরিস্ফুটিত হয়েছে।

সংস্কৃতিসেবী এই মানুষটি সারা জীবনই অর্থনৈতিক ভাবে অস্বচ্ছল ছিলেন। তাতে তাঁর কোনো ক্ষোভ ছিল না। পরম ঐশ্বর্যশালী পিতার পুত্র হয়েও গোলপাতার চালের মাটির ঘরে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে কখনো আক্ষেপ করেননি-  বরং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সম্মাননায় আবেগে আপ্লুত হতেন। আর্থিক অনটনের কারণে লেখাগুলো প্রকাশনার সুযোগ পায়নি বলে তাঁর বিরল প্রতিভা কেন্দ্রাভিমুখী হয়নি। তারপরও পরিচিতি এবং সম্মাননা পেয়েছেন অনেক। প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব খায়রুল বাসারের একান্ত সহযোগিতায় ১৯৮১ সালের ৯ মে তারিখে বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে তাঁর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়-‘সজনে বিজনে’ অনুষ্ঠানে। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ বেতার, খুলনা কেন্দ্র থেকেও তাঁর একটি সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়-একজন সুদক্ষ অভিনেতা, নাট্যকার এবং সংগীতজ্ঞ হিসেবে। তিনি সাতক্ষীরার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব আয়োজিত গুণীজন সংবর্ধনা-১৯৯০-এ একজন নাট্যব্যক্তিত্ব হিসেবে সংবর্ধিত হয়েছেন। একই বছর সাতক্ষীরা জেলা সাংস্কৃতিক পরিষদও তাঁকে নাট্যশিল্পী হিসেবে সংবর্ধিত করে। একজন সংগীতজ্ঞ হিসেবে লিনেট ফাইন আর্টস সাতক্ষীরা থেকে পেয়েছেন- ‘লিনেট পদক-১৯৯৯’ (মরণোত্তর) এবং সাতক্ষীরা কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরী সম্মাননা ২০১০ (মরণোত্তর)। এছাড়া সাতক্ষীরা জেলা সাংস্কৃতিক পরিষদ ২০১০ সালে ‘আম্রকানন যাত্রাপার্টি ’ নাটকটি প্রকাশ করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

১৯৯১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এই প্রাণপুরুষ নিভৃতচারী শিল্প কারিগর ইহধাম ত্যাগ করেন। তাঁর স্মৃতিকে জাগরুক রাখতে সাতক্ষীরা জেলা সাংস্কৃতিক পরিষদের উদ্যোগে ১৯৯৯ সালে তাঁকে ‘ওস্তাদ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয় এবং পৌর কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে ‘ওস্তাদ কাওছার আলী সরণী’ নামে তাঁর সাতক্ষীরাস্থ বাসভবন সংলগ্ন সড়কটির নামকরণ করা হয়। 

ওস্তাদ শেখ মোঃ কাওছার আলীর মৃত্যুর বিশ বছর পর-যখন তাঁর লেখা পান্ডুলিপি গুলো বিনষ্টপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে- তখন সাতক্ষীরার সুযোগ্য জেলা প্রশাসক, বিশিষ্ট সাহিত্যবোদ্ধা, কবি মোঃ আবদুস সামাদের একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই রচনাবলী প্রকাশ করা সম্ভব হলো-যা সাতক্ষীরাবাসীর জন্যে এবং বাংলা নাট্যজগতে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে। 

২.

নাটক সমাজের দর্পনস্বরূপ। যে নাটক, শিল্প ও সাহিত্য সমাজ পরিবর্তনে সহায়ক হয় সে সমাজের অন্ধকার কুসংস্কারাচ্ছন্ন দিকগুলো তুলে ধরে আলোকিত পথের সন্ধান করে। শেখ মোঃ কাওছার আলীর নাটকে শিল্প ও সাহিত্যে এ বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি কেবলমাত্র দর্শক নন, বিবেকবান আলোসন্ধানি মানুষ। তাই তিনি ক্ষতগুলোকে চিহ্নিত করে উপস্থাপন করেছেন। আত্মসমালোচনা করেছেন শিল্পের দায়বোধ থেকে। তাঁর নাটক রচনা শুরু পঞ্চাশের দশক থেকে। সেই সময়ের ভারতবর্ষের প্রখ্যাত নাট্যাচার্য শিশির ভাদুড়ী এবং নাট্যগুরু শম্ভুমিত্রের নাটকের আদল নাটকগুলোতে পরিস্ফুট। তাঁর প্রায় সকল নাটকই মঞ্চ সফল।

‘কেন’ নাটকটির রচনাকাল ১৯৫৬-১৯৫৮। এটি একটি সামাজিক বিয়োগান্ত নাটক। তিন অঙ্কের মোট চৌদ্দ দৃশ্যের নাটকটির উপক্রমণিকা বেশ নাটকীয়। একজন নাট্যরূপকারের গল্প লেখনীর মধ্য দিয়ে নাটকের শুরু। গল্প বলার ঢঙে নাটকের কাহিনী বিন্যস্ত। নাটকটিতে একই সাথে ত্রিমুখী ধারা উৎসারিত। প্রথমতঃ সামাজিক নাটক হিসেবে জুবেরা চরিত্রের ছেলে হারানোর দুঃখ, বেদনা, আশা আকাঙ্খা যেমন প্রতিফলিত হয়েছে তেমনি মফিজ শিরীনের প্রেম নাটকটাকে উদ্বেলিত করেছে। দ্বিতীয়তঃ ব্যবসায়ী আমির চাঁদের কুচক্রী দলের কার্যকলাপে সামাজিক অবক্ষয়ের দিকটি ফুটে উঠেছে। আমির চাঁদ ছোট ছোট শিশুদের ধরে এনে বিকলাঙ্গ করে ভিক্ষাবৃত্তিতে লাগিয়ে বিশাল ব্যবসায়িক ফাঁদ তৈরী করেছে। আমির চাঁদ চরিত্রে সমাজের শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে নাট্যকারের কটাক্ষ সুস্পষ্ট। তৃতীয়তঃ এই নাটকে মংলুর কাটা পা ডঃ ইলাহীর গবেষণা লব্ধ আবিস্কারের মাধ্যমে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যে সময়ে মানুষের বিচ্ছিন্ন অংগে নতুন অঙ্গ প্রতিস্থাপনের বিষয়টি বৈজ্ঞানিক কল্পনার বাইরে ছিল-সেই সময়ে এই ধরণের কল্প বৈজ্ঞানিক চিন্তার রূপরেখা নাট্যকারের গভীর চিন্তন এবং মননশীলতার পরিচায়ক। সার্বিক দিক থেকে নাটকীয়তায় কাহিনী বিন্যাসে, চরিত্র চিত্রণে এবং মঞ্চায়নে নাটকটি সার্থক। নাটকটির মঞ্চায়ন দেখে তৎকালীন সাতক্ষীরা মহাকুমা প্রশাসক এ.কে.এম সিদ্দিক উল্লাহ যথার্থই মন্তব্য করেছেন- ‘‘---In this drama, the author has emphatically tried to prove the strong will of the providence that prevails, through the joys and cares of human life in a lucid manner. He has been able to keep up the dramatic style and sences throughout the book making it an interesting study as well as an excellent book for the stage.---’’

‘একটি প্রান্তর’ (১৯৬৫) একটি হাস্যরসের নাটক। এ নাটকে দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে পথে থেমে থাকা রেলগাড়ির কিছু বিক্ষিপ্ত যাত্রীর কার্যকলাপ চমৎকার ভাবে বর্ণিত হয়েছে। নারী বর্জিত একাঙ্কিকাটিতে হাস্যরস ও কৌতুকের মধ্য দিয়ে কাহিনী বিস্তৃত হয়েছে। চোরাচালানী এক চক্রকে এ নাটকে সক্রিয় দেখা যায়- যারা টিফিন ক্যারিয়ারে পরোটার মধ্যে সোনা পাচার করছিল। কৌতুকরসে মিশ্রিত এ নাটকটির মধ্যে নাট্যকারের চোরাচালান বিরোধী মনোভাবের মাঝে স্বদেশপ্রীতি ফুটে উঠেছে।

‘ওদের কি হলো’ (১৯৬৭) একটি ক্রাইমো সোশ্যাল নাটক। এ নাটকেও ত্রিমুখী ধারা পরিলক্ষিত হয়। মিলনান্তক এ নাটকে একদিকে ফরিদা ও কামরুলের প্রেমের বিষয়টি পরিচ্ছন্ন ভাবে কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। প্রথম পর্বে কামরুলের ভীরুতা, মধ্য পর্বে তার অন্তর্ধান ও শেষ পর্বে প্রকৃত বীরোচিত চরিত্র প্রকাশের মধ্যে দিয়ে ফরিদা ও কামরুলের মিলনের মাঝে যে ক্লাইম্যাক্স ফুটে উঠেছে তা উপভোগ্য। অপরদিকে মামুন হত্যা ষড়যন্ত্রের রহস্য উন্মোচন নাটকের আর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক। এই নাটকে সুবেশধারী মিঃ চৌধুরীর সুন্দর চেহারার আড়ালে যে কুচক্রী মানসিকতা ফুটে উঠেছে তা সমাজের তথাকথিত মুখোশধারী শোষক গোষ্ঠির প্রতিচ্ছবি। ‘কিম্ভুত’ নামক চরিত্র চিত্রণের ভিতর নাট্যকার মিঃ চৌধুরীর যে প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

‘কাঁটাতার’ (১৯৬৯) একটি শিশুতোষ সামাজিক নাটক। দরিদ্র ক্যাশিয়ার পিতার এগারো সন্তানের পরিবারের চিত্র ফুটে উঠেছে এ নাটকে। ‘আসাদ’ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে রচিত এ নাটকের আসাদ চরিত্রের মধ্যে মুক্তিকামী এক আলোকিত মানুষের দেখা পাওয়া যায়। ‘‘তবে চলো-সামনে ঐ পথ। ঐ পথ আমাদের ডাকছে। ঐ সংকীর্ণ, নোংরা পথকে আমাদের পরিস্কার আর প্রশস্ত করতে হবে। ঐ পথকে করতে হবে সরল-করতে হবে নিস্কন্টক। দূর করে ফেলতে হবে পথের সব আবর্জনা, সব জঞ্জাল।’’- আসাদের এই সংলাপের মাঝে মুক্তিকামী মানুষের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আসাদের প্রতিনিধি যেন এই আসাদ।

‘আম্রকনন যাত্রাপার্টি’ (১৯৭৪) একটি ব্যঙ্গাত্মক নাটক। কতকগুলো ব্যঙ্গ চরিত্র দিয়ে কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতির প্রতি নাট্যকারের শ্লেষ ও প্রতিবাদ এ নাটকে প্রতিফলিত হয়েছে। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র পঞ্চপিরিতের- ‘‘পারবে না- পারবে না তুমি মানুষকে এভাবে তাদের সংগ্রাম থেকে নিরস্ত করতে। সবার সামনে আজ পথ খুলে গেছে। সে পথে আজ তারা চলবেই। বিশ্বের শোষিত, লাঞ্ছিত মানুষ আজ সংগ্রামের পথ ধরেই চলবে। কেউ রোধ করতে পারবে না- সে চলা। তোমার এ যাত্রাপার্টিকে তারা শুধু ভেঙ্গেই ক্ষান্ত হবে না- তোমাকেও তারা নামিয়ে ছাড়বে ঐ নোংরা নর্দ্দমায়।’’- এই সংলাপে নাটকের মূল সুর অনুরণিত হয়েছে। অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং সুষ্ঠু সংস্কৃতির বিকাশ সাধনে সমাজ চেতনার উম্মেষ ঘটানোর লক্ষ্যেই রচিত এ নাটক।

‘সিন্ধুবাদের দৈত্য’ (১৯৭৭) একটি রূপক নাটক। এ নাটকে ‘মহাকাল’ কে সিন্ধুবাদের দৈত্যের সাথে তুলনা করা হয়েছে। সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। সময়ের সদ্ব্যবহার না করলে তার পরিণতি ভয়াবহ। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে রচিত ও মঞ্চস্থ এ নাটকে নাট্যকারের মূল অভিব্যক্তি এরূপ যে, পুরাতন দিনের গ্লানি মুছে ফেলে, পুরানো বছরের কালিমা ধুয়ে ফেলে নতুন বছরে নতুন শপথ নিয়ে জীবনকে উজ্জীবিত করা। রূপকার্থে সিন্ধুবাদের দৈত্যের নেপথ্য চরিত্র ও সংলাপ সৃষ্টিতে নাট্যকার পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন।

‘আবর্জনার স্ত্তপ থেকে বলছি’ (১৯৮০) একক নাটক। নাটকটির একক চরিত্র বোম্বা-মিসর সম্রাট ফারাও এর একজন ক্রীতদাস। ছয় হাজার বছর আগের এই ক্রীতদাস চরিত্র আজো লাঞ্ছিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত শ্রমিক ও মজদুরের মধ্যে-আর্তহাহাকার নিয়ে বিমূর্ত হয়ে আছে- এমনটিই এই নাটকের মূল সুর। বিশ্ব শ্রমিক দিবসকে সামনে রেখে রচিত এ নাটকটিতে ফুটে উঠেছে শ্রমিক মজুরের আর্ত-আহাজারি। ‘‘---এ পৃথিবীর একদল লোক যারা দেবতা বলে কথিত হয়, যারা এই সুবিস্তীর্ণ আলোর বন্যার নির্যাসটুকু একা নিজেরাই ভোগ দখল করতে চায়, তারা তা’ করবার জন্যে তাদের জুতার তলার ছায়ার অন্ধকারে আমাদের নির্বাসিত করে রাখে। তাই এই আলোর পৃথিবীতে আজো একদল প্রভু আর একদল ভৃত্য। একদল সম্রাট আর একদল দাস; একদল শ্বেত সফেদ আর একদল কালো কুৎসিত। ---’’ এই সংলাপের মধ্য দিয়ে নাটকের মূল বক্তব্য পরিস্ফুট হয়েছে। শ্রেণী বিভক্ত সমাজের বৈষম্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে একদিকে এ সমাজকে আঘাত করেছেন অন্যদিকে শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তাকে উপলব্ধিতে এনেছেন লেখক।

‘অতলান্তিকের প্রান্ত’ (১৯৮৭) বেতার নাটক। এ নাটকটিতে নাট্যকারের কল্প বৈজ্ঞানিক মানসিকতার রূপ ফুটে উঠেছে। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র আবু সাদের-‘‘--- আমার এই আবিস্কারের নাম-‘হিপনো টেলিপ্যাথি’। এতে করে মানুষের অবচেতন মনে গেঁথে যাওয়া অতীত দিনের কথা বা ঘটনা সম্পূর্ণটাই তার চিন্তার মাধ্যমে আমার স্ক্রীনে ভাসিয়ে উঠানো সম্ভব।---’’-এই সংলাপের মধ্যে নাটকের মূল সুর প্রতিফলিত হয়েছে। এ নাটকে বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের মাধ্যমে নাট্যকার মানুষের মস্তিস্কের স্নায়ুতে যে চিন্তা চেতনার উদ্ভব হয়- তার সবাক চিত্র সৃষ্টির কল্প প্রয়াস পেয়েছেন, যেটি আজো বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের উর্ধ্বে। নাট্যকারের এহেন কল্প-বৈজ্ঞানিক রূপ নাটকটির দ্বন্দ্ব সৃষ্টিতে সহায়ক হয়েছে।

নাটকের পাশাপাশি ষাটের দশকে তিনি কিছু ছড়া, কবিতা ও গান রচনা করেছেন। তাঁর ছড়া ও কবিতাতে রসবোধ প্রবল। গানের মধ্যে গজল যেমন আছে তেমন প্রেমের গানও আছে। গানের মধ্যে মূলতঃ প্রেমকেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন। শুধু গান রচনাই নয় সুকণ্ঠ গায়ক হিসেবেও তাঁর যথেষ্ট সুখ্যাতি ছিল। তিনি ভারতীয় আধুনিক বাংলা ও হিন্দী গান গাইতে সবচেয়ে পছন্দ করতেন। বাড়ীতে ছিলো গ্রামোফোন রেকর্ডার। নতুন গানের রেকর্ড বের হলেই তা কিনে আনতেন এবং গ্রামোফোনের সাথে গলা মিলিয়ে তা’ কণ্ঠস্থ করতেন। তখনকার জগন্ময় মিত্র, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, কে.এল. সাইগল, মুকেশ, পান্নালাল ভট্টাচার্য প্রমুখের গান তাঁর কণ্ঠে নতুন মাত্রা সৃষ্টি করত। এছাড়াও তিনি ধর্মীয় গান, কীর্ত্তন ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত গাইতে পছন্দ করতেন। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের শিক্ষক হিসেবে খ্যাতি লাভ করায় তিনি ‘ওস্তাদ’ উপাধিতে ভূষিত হন। 

শেখ মোঃ কাওছার আলী কিছু গল্পও লিখেছেন। তাঁর গল্পে বাস্তব সমাজ চিত্র ফুটে উঠেছে। ‘আমি স্মাগলার’ একটি বড় গল্প, এ গল্পে মূলতঃ একজন কালোবাজারীর মনোলোকের স্বপ্ন বর্ণিত হয়েছে। মানুষ যখন অপকর্ম করতে করতে চরমে পৌঁছে তখন সে খোদ শয়তানকেও হার মানায়-এটিই এ গল্পের মূল উপজীব্য। ‘সেই কুকুরগুলো’ বাজার বন্দনামূলক একটি লেখা। ছোটগল্পের আঙ্গিকে উর্ধ্বমূল্যের বাজারে একজন ছাপোষা পিতার যে আকুতি- তা এ গল্পে বর্ণিত হয়েছে। উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের পার্থক্য গল্পটিতে এভাবে দেখা যায়- ‘‘- খেয়ে না খেয়ে থাকে একদল আর খেয়ে খেয়ে অরুচিতে ভোগে একদল।’’ মানুষের পশুবৃত্তি এবং পশুর পশুবৃত্তি ফুটে উঠেছে তাঁর লেখায় এভাবে- ‘‘পশুরা বুদ্ধিহীন এবং বোবা। যা পায় তাই খায়। আবার খাওয়া খাবারের জাবর কাটে। আমরা বিদ্যাশিক্ষা করেছি নির্বোধের মত। আমরা বোকা পশু। বোবাও বটে। দুঃখজনক ভাবে বোবা। বিদ্যাশিক্ষা করেও আমরা কথা কইতে পারিনে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারিনে। প্রতিকারের প্রশ্নই তো আসে না। আমাদের মত শিক্ষিত পশু আর কে আছে। আমরা জানছি, বুঝছি। জেনে, বুঝেও সব অত্যাচার, সকল লাঞ্ছনা মাথা পেতে নিচ্ছি। নিতে হচ্ছে।’’ গল্পের উপসংহারে বর্ণিত- ‘‘আজ ঢাকার বাজারে গোস্তের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মনে প্রশ্ন জাগছে একটাই, দেশ ভাগ হয়েছে। আমরা স্বাধীন হয়েছি, সেই ইংরেজ সাহেবরা আর নেই। চলে গেছে যে যার ঘরে- সেই ব্রিটেনে। কিন্তু তাদের সেই ভালবাসার পাত্র সেই কুকুরগুলো কি সঙ্গে নিয়ে যায়নি? নাকি আমাদের দেশেই তাদের ছেড়ে রেখে গিয়েছে? আজ আমরা স্বাধীন হয়েছি। তবু আমাদের মত মানুষ আজ বাজারে গিয়ে ট্যাঁকে টাকা থাকতেও কিউ এ দাঁড়িয়ে পায়ের চটি হারিয়ে, মাথার চুল ছিঁড়ে, পাঞ্জাবীর হাতা হারিয়ে হতাশ হয়ে বাসায় ফিরে আসে কেন? ফিরে আসতে হয় কেন?’’- অংশটুকু পড়তে পড়তে মনে পড়ে যায় সৈয়দ মুজতবা আলীর বিখ্যাত গল্প ‘পাদটীকা’-র সেই পন্ডিত মশাইয়ের আক্ষেপের কথা।

‘বড় যদি হতে চাও’ সমাজতন্ত্রের আদর্শ ভিত্তিক একটি ছোটগল্প। ‘রাজপথ’ এদেশের রাজনৈতিক নেতাদের ভোট কারচুপির বিষয় নিয়ে লেখা ছোটগল্প। ‘দিববু ঘোষের দিব্যজ্ঞান’ একটি রম্যরচনা। এ রচনাটিতে ভেজাল খেতে খেতে আমরা কিভাবে ভেজালে অভ্যস্ত হয়ে গেছি এবং খাঁটি জিনিস আমাদের জন্যে ভেজালের প্রভাবে কিভাবে অসহ্য হয়ে উঠেছে তার চিত্র সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে। ‘ফেলুদা স্মরণে’ একটি স্মৃতিচারণমূলক লেখা। ‘সামান্য’ এবং ‘কেমন হতো’ দু’টি ছোটগল্প। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা ছাত্রদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে তাদের ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করেন এবং এভাবে আমাদের ভবিষ্যতকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়া হয়- রাজনীতির এই ঘৃণ্য পথের চিত্র ফুটে উঠেছে ‘সামান্য’ গল্পে। কথার ফুলঝুরি দিয়ে পেট ভরে না- কাজ করা দরকার। আমাদের এই অতিকথন ও মিথ্যাবাদিতার বদ অভ্যাসের দিকে লেখকের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে ‘কেমন হতো’ গল্পে।

শেখ মোঃ কাওছার আলী নাটক, ছোট গল্প, স্মৃতিকথা, গান, কবিতা ও গজল রচনা করেছেন একই সাথে কন্ঠশিল্পের ওস্তাদি করেছেন দক্ষতার সাথে।

 

ওস্তাদ শেখ মোঃ কাওছার আলীর কিছু লেখা নিয়ে "কাওছার আলী রচনাসমগ্র" নিন্মে আপলোড করা হলোঃ